অনু গল্প: বিগব্যাং গোলাপের ক্রিস্কোগ্রাফ

0
667

 অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

১.
গোলাপ ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য মানুষকে বিমুগ্ধ করে | প্রকৃতিও বিমোহিত হয় এই বিচিত্র সৌন্দর্যে | সূর্যের তীব্র আলো আর চাঁদের ম্রিয়মান আলো আঁধারে গোলাপ তার নয়নাভিরাম রূপের লীলা বিলাসে পূলক জাগায় মনের দুয়ারে | সবাই এই রূপে প্রাণের আবেগে উদ্বেলিত হয়ে বলে ” গোলাপ হলো রূপের রানী” | অনেক তরুণ প্রেমে পড়ে যায় গোলাপের আলতো ছোঁয়ায় | গোলাপ তার রূপের প্রশংসা শুনতে শুনতে একদিন অহংকারী হয়ে উঠে | অহংকার তার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় | নিজের রূপের গর্বে উদ্ধত হয়ে যায় গোলাপ | গোলাপের ভিতর থাকে গন্ধ | সবাই গোলাপকে দেখতে পায় কিন্তু গন্ধকে কেউ দেখতেও পায়না আর তার প্রশংসাও কেউ করেনা | যদি কখনো কেউ গোলাপের গন্ধের কথা বলে তখন হিংসায় জ্বলে উঠে গোলাপ | একদিন গোলাপের খুব রাগ হলো গন্ধের প্রতি | সে গন্ধকে তার ভিতর থেকে বের করে দিলো | দুঃখ পেলো গন্ধ | গন্ধের অদৃশমান বোবা কান্না দেখতে পেলোনা কেউ | এরপরের ঘটনা | মানুষেরা দূর থেকে গোলাপের রূপের কথা বলে | কিন্তু যখন কাছে এসে ফুলের অনাবৃত দেহে শিহরিত হয়ে স্পর্শ করতো, তখন বলতো ” না, এই গোলাপ তো সেই রূপের আলোয় উদ্ভাসিত গোলাপ নয়, কোথায় যেন একটা অপরিপূর্ণতার অনুভূতি | মানুষ , প্রকৃতি সবাই গোলাপের প্রতি বিরূপ হলো | সবাই বলতে লাগলো গোলাপের যে পরিনত সৌন্দর্য ছিল তা আজ নেই | কিসের যেন একটা অভাব আর অপূর্ণতা | সবাই গোলাপ থেকে দূরে সরে গেলো | অনেকে বললো এই গোলাপ আর কাগজের গোলাপের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই | গোলাপ খুব কাঁদলো | তারপর শান্ত হয়ে চিন্তা করলো কোথায় যেন সে একটা ভুল করেছে | একদিন এক পথিক গোলাপের বাগান দেখতে এলো | সেও খুব নিরাশ হলো | গোলাপ তাকে জিজ্ঞাসা করলো “তুমি কেন আমায় দেখে বিমোহিত নও?” পথিক বললো মানুষের বাইরের চেহারাটা সুন্দর হতে পারে | মানুষটা যদি নারী হয় তাহলে পুরুষরা পুলকিত হয় আর মানুষটা যদি পুরুষ হয় তবে নারীরা পুলকিত হয় | এটা মানুষের বাইরের সৌন্দর্য | এটা সাময়িকভাবে মানুষকে আকৃষ্ট করে | কিন্তু মানুষের ভিতর যদি বিবেক না থাকে তবে তাকে অমানুষ বলে | আর অমানুষকে মানুষ প্রকৃত মানুষ হিসেবে মনে করেনা | তার থেকে দূরে সরে যায় | তেমনি গোলাপের ভিতরের সৌন্দর্য হলো তার সুগদ্ধ | গন্ধ যদি গোলাপের ভিতর না থাকে তবে তাকে জীবন্ত গোলাপ বলা যায়না সেটা হলো প্রাণহীন কাগজের গোলাপের মতো | গোলাপ তার ভুল বুঝতে পারলো | সে গন্ধকে ডেকে আনলো আর তার ভিতরে ধারণ করলো | গোলাপ ফুলের সৌন্দর্যে মহিমান্বিত হলো আবার সবাই |

২.

মানুষকে দূর থেকে দেখে বোঝা যায়না তার ভিতর কলঙ্ক আছে কিনা ? চাঁদের নাকি কলঙ্ক আছে ? কিন্তু গোলাপের কি কলঙ্ক আছে | গোলাপ ফুল ভাবতো তার মধ্যে কোনো কলঙ্ক নেই | সে সবার থেকে আলাদা | তার বৃন্তের পরতে পরতে আছে পবিত্রতার আর নিস্কুলতার আলো আর বিকাশ | কিন্তু একদিন এক কবি গোলাপ ফুলের কাছে এসে বললো “ওগো কলঙ্কিনী গোলাপ, তোমার কলঙ্ক আমার অলৌকিক আনন্দের ভাব, কোনো এক শব্দহীন অচেনা মনের প্রলাপ”| কথাটা শুনে বিস্মিত হলো গোলাপ | রেগে উঠে গোলাপ বললো “আমি তো আলোর মতো পবিত্র, নিস্কলুষ আমার সৌন্দর্য | আর তুমি বলছো আমি কলংকিত | তুমি যদি মিথ্যে বলো তবে কোনোদিন তুমি আমাকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারবেনা | আমি এর প্রমান চাই |” কবি গভীর অনুভূতির অতল সমুদ্র থেকে বেরিয়ে এসে বললো ” প্রতিদিন তোমার প্রতিটি বৃন্তে আছড়ে মৌমাছির দল | তোমার রসের ভান্ডার থেকে তারা টেনে আনে রস | সেই রসে সিক্ত হয়ে মধু সঞ্চয় করে মৌমাছির দল | তাহলে কি তোমাকে নিস্কলুষ বলতে পারবে |” গোলাপ লজ্জিত হলো | গোলাপের লাল শব্দহীন হয়ে গেলো | তার মনে হলো যেন একটা ঝড় এসে তার জীবনে দমকা হাওয়ার মতো আঘাত করেছে | কবি আরো বললো “মৌমাছিদের এর জন্য শাস্তিও পেতে হয় | মানুষ মৌমাছিদের তিলে তিলে গড়া মৌচাক ভেঙে মধু নিয়ে পালিয়ে আসে | সেই মধু খেয়ে অমৃতের সুধা পায় মানুষ | মৌমাছিরা গোলাপকে ক্ষত বিক্ষত করে মধু আনে আর তার সুফল নেয় মানুষেরা | তাহলে গোলাপ কি কলংকিত, মানুষ কি স্বার্থপর নাকি এটা মৌমাছিদের অনিবার্য শাস্তি |”

৩.

একটা লেখা থেকে পেলাম খুব সুন্দর কতগুলো উপমা | যেমন:

“লাল গোলাপের কুঁড়ি নিষ্পাপ ভালোবাসা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আদিকালে হলুদ রংয়ের গোলাপ ফুল ঈর্ষার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে হলুদ রংয়ের গোলাপ বন্ধুত্ব, বাড়ির সুখশান্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। “দূঃখিত” অর্থ প্রকাশের জন্যও হলুদ গোলাপ ব্যবহৃত হ্য়। সাদা গোলাপ সাধারনত নিরীহ, পবিত্রতা, সরলতা, সততা, অনুরাগ ইত্যাদির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটি সাধারনত বিবাহের অনুষ্টানে প্রচুর পরিমানে ব্যবহার হয়ে থাকে। সাধারনত, পিংক রংয়ের গোলাপ এবং পিংকের সাথে ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের মিশ্রিত গোলাপ ফুল রোমান্স, সৌন্দর্য, শালীনতা, সুশ্রী, আনন্দ, উল্লাস এবং প্রত্যাশার প্রতীক। গাঢ় পিংকের গোলাপ অথবা তীক্ষ্ণ পিংক রংয়ের গোলাপ কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ প্রদানের প্রতীক। পিংক এবং লাল গোলাপের মিশ্রিত ফুলের তোড়া রোমান্টিক অংশীদারিত্বকে নির্দেশ করে। কারো জীবনের বিরাটরকমের অর্জন কমলা রংয়ের গোলাপ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। তাই, বিভিন্ন ডিগ্রী অর্জন বা চাকরির প্রোমোশনে কমলা রংয়ের গোলাপ দেওয়া হয়। পীচ রংয়ের গোলাপ সাধারনত কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ বাহী বার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই কেউ যদি কাউকে ধন্যবাদস্বরুপ বার্তা পাঠাতে চাই তখন পীচ রংয়ের গোলাপ পাঠিয়ে দেয়।পার্পল রংয়ের গোলাপ শাশ্বত ভালোবাসার প্রতীক। লাভেনডার বা লিলাক রংয়ের গোলাপ ফুল সত্যিকার ভালোবাসার শুরুকে নির্দেশ করে। পার্পল রংয়ের গোলাপ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় বিবাহবার্ষিকীতে(২৫ বছর বা তদূর্দ্ধ)। অন্তরঙ্গ মূহুর্তে সাধারনত খুব গাঢ় পার্পল রংয়ের গোলাপ ব্যবহৃত হয়।কালো গোলাপ সাধারনত মৃত্যু বা দূঃখের প্রতীক। তাই কালো গোলাপ সবচেয়ে বেশি অন্তেষ্টিক্রিয়া বা সমাধিস্থলে প্রদান করা হয়। কালো গোলাপ ভূল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কালো গোলাপ কাউকে দেওয়ার আগে লোকটির বিশ্বাস সম্পর্কে ভালো ধারনা থাকা খুব দরকার।”

এই বিভিন্ন রঙের গোলাপ নিয়ে গল্প | কয়েকজন দেশ বিদেশের পর্যটক গোলাপ দেখার জন্য গোলাপের যাদুঘরে এসেছে | লাল, হলুদ, সাদা, পিংক, কমলা, পীচ, পার্পল, কালো গোলাপের মধ্যে ঝগড়া শুরু হলো | এক গোলাপ আরেক গোলাপকে বললো আমার রং তোমার থেকে সুন্দর | এভাবে তারা বাকবিতন্ডা করতে লাগলো | সব রঙের গোলাপেরই একটাই কথা ঐ পর্যটকেরা আমার কাছেই আসবে | কিন্তু বিষয়টা ঘটলো ভিন্নভাবে | একেক পর্যটক একেক রঙের গোলাপের কাছে গেলো আর প্রাণভরে তার সৌন্দর্য আহরণ করলো | কিন্তু লাল গোলাপ ভাবছিলো সব পর্যটকরাই তার কাছে আসবে, অন্য রঙের গোলাপের কাছে যাবেনা | অন্য রঙের গোলাপেরাও লাল গোলাপের মতো ভাবলো | কিন্তু তাদের ভাবনাটা সত্য হলোনা | আসলে প্রকৃতির মধ্যে যে বৈচিত্র আছে সেই বিচিত্র বৈচিত্র মানুষের মধ্যেও আছে | বৈচিত্র ছাড়া পৃথিবী অর্থহীন |

এখানে শিক্ষণীয় বিষয় গুলো হলো:

১ | মানুষের পূর্ণতা তার বাইরের দেহের মধ্যে নয় | প্রকৃত পূর্ণতা পাওয়া যায় যদি মানুষ বিবেক তাড়িত হয়ে কাজ করে | তার মধ্যে মানবিক মুল্যবোধ কাজ করে | আত্মা না থাকলে মানুষের দেহকে মৃতদেহ বলে |

২| কলঙ্ক যেন মানুষের অবচেতন মনকে কলংকিত করতে না পারে | সব মুছে ফেলা যায় কিন্তু চরিত্রে কলঙ্ক লাগলে তা কখনো ধুয়ে ফেলা যায়না | আর যারা অন্যায়ভাবে মানুষকে কলংকিত করতে চায় তাদের শাস্তি পেতে হয় | এটাই প্রকৃতির নিয়ম |

৩| মানুষের পছন্দের মধ্যে ভিন্নতা থাকে | আর ভিন্নতা আছে বলে মন বৈচিত্রকে ভালোবাসে | বৈচিত্র ছাড়া জীবন থেমে যায় | তাই জীবনকে বৈচিত্রপূর্ণ করে গড়ে তুলুন |

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

লেখক পরিচিতি:

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here