বারো রকমের মানুষ

0
200
রেজানুর রহমান

রেজানুর রহমান

আমরা যারা নাটক সিনেমা বানাই তারা প্রায় প্রতিদিনই বারো রকমের মানুষের মুখোমুখি হই। বিশেষ করে আউট ডোরে শ্যুটিং করতে গেলে নানা ধরনের বিচিত্র সব চরিত্রের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়। শুরুর দিকে অনেকেই আগ্রহ ভরে এগিয়ে আসেন। পরিচালকের খোঁজ করেন। এমনও হয়, নিজের বাড়িতে শ্যুটিং করার জন্য অনুরোধও করেন অনেকে। সে কি কাকুতি মিনতি। ভাই আমার বাসাটা কিন্তু ফাশ ক্লাশ। বড় বড় রুম আছে। মেঝেতে টাইলস বসিয়েছি। এসি আছে। গিজার আছে। শ্যুটিং করতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমার নিজের শহর সৈয়দপুরে একবার শ্যুটিং করতে গিয়ে বন্ধুর বাড়িতে ইউনিট নিয়ে হাজির হলাম। পরিবারটি বেজায় খুশি। সব চেয়ে খুশি তার একমাত্র মেয়ে। যাকে পায় তাকেই শ্যুটিং দেখানোর জন্য ডেকে নিয়ে আসে। শ্যুটিং শুরু হলো। বাড়িটা তখন বন্ধুর পরিবারের থাকলো না। শ্যুটিং ইউনিটের সদস্যরাই যেনো সেই বাড়ির মালিক। ঘরের খাট এখান থেকে ওখানে নিচ্ছে। আলমারী সরাচ্ছে। ডাইনিং টেবিল যেখানে ছিল সেখানে নাই। বাসার সদস্যদেরকেই চিৎকার দিয়ে বলা হচ্ছে- অ্যাই কেউ কথা বলবেন না, একদম চুপ…

প্রথম দিন পরিবারের সবাই চুপ থাকলো। পরের দিন শ্যুটিং করতে গিয়ে দেখি বন্ধুর আদুরে মেয়েটি আমার আশে পাশে ঘুর ঘুর করছে। এক পর্যায়ে সাহস করে কাছে এসে বলল- আংকেল আপনারা আর কয়দিন শ্যুটিং করবেন? মৃদু হেসে বললাম- আরও দুইদিন? শুনে মেয়েটি যেন আঁতকে উঠলো- না, না… আমার পারবো না। আপনারা আজই শ্যুটিং শেষ করেন…

এরকম ঘটনা আরও অনেক আছে। সে কারণে আমি শ্যুটিং করতে ঢাকার বাইরে যাওয়ার আগে ইউনিটকে চাপ দেই যাতে কোনো বাসা-বাড়িতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরকে না রাখে। কিন্তু এবার আমার নতুন টেলিফিল্ম ‘ছবি’র শ্যুটিং করার জন্য গাজীপুরের অদূরে মাওনার একটি বিশিষ্ট দানশীল পরিবারের বাড়িকেই বেছে নিলাম। বাড়ির মালিকের সঙ্গে আমার আদৌ কোনো পরিচয় নাই।

দৈনিক সমকালের গাজীপুর প্রতিনিধি কবি ইজাজ আহমেদ মিলনের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিল সে। সেই সূত্রে পরিচয় গাঢ় হয়েছে। আমি ওর কবিতার ভক্ত। ‘ছবি’ টেলিফিল্ম এর জন্য মফস্বল শহর এবং একটি বড় কলেজ খুঁজছিলাম। ফোনে মিলনের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করি। মিলনই মাওনায় শ্যুটিং করার পরামর্শ দেয়। একদিন মাওনায় গিয়ে কলেজ আর একটি বাড়িও দেখে এলাম। গল্পের সঙ্গে বাড়ি এবং কলেজ দুটোই মিলে যাচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম মাওনাতেই শ্যুটিং করবো। বিশিষ্ট অভিনেতা মামুনুর রশীদ, শাহাদৎ হোসেন, সুমনা সোমা, শাহানা সুমি, রাজিব সালেহীন, সুকর্ন হাসান, মিন্টু সরদার সহ ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ জনের টিম মাওনায় যাবে। আগের দিন আমার প্রিয় অভিনেতা, নাট্যগুরু মামুনুর রশীদ বললেন তিনি ত্রিশালে একটা অনুষ্ঠানে এসেছেন। সেখান থেকেই মাওনায় যেতে চান। কিন্তু মাওনায় তিনি থাকবেন কোথায়? মিলনই সমস্যার সমাধান করে দিল। বলল, রেজা ভাই আপনি চিন্তা করবেন না। রাতে মামুন স্যারের থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তিনি পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল আককাস আলী স্যারের বাড়িতে থাকবেন। তার কথায় সম্মতি দিলাম। কিন্তু পুরোপুরি আশ্বস্থ হতে পারলাম না। মাথায় নানা প্রশ্ন, নানা আশঙ্কার কথা ঘুর পাক খাচ্ছে। আচ্ছা, মামুনুর রশীদ যে বাড়িতে থাকবেন সেই বাড়ির মানুষেরা ভালো তো! পাছে না মামুন ভাই কোনো বিপদে পড়েন। কী সাংঘাতিক! এমন যদি কিছু ঘটে তাহলে দেশব্যাপি তোলপাড় শুরু হবে। তখন আমার দশাটা কি হবে?

রাতে কয়েকবার মামুন ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো। বুঝলাম তিনি ভালই আছেন। ঢাকা থেকে পরের দিন ঢাকা থেকে কিভাবে আসছি খোঁজ নিলেন। তবুও রাতে ঘুমাতে পারলাম না। পরের দিন খুব ভোরেই ইউনিট নিয়ে ঢাকা থেকে রওয়না দিলাম মাওনার উদ্দেশে। হায়রে ট্রাফিম জ্যাম। গাড়ি একটু এগিয়েই থেমে যায়। মাওনায় পৌঁছলাম সকাল ১১টায়। প্রথমেই মামুন ভাইয়ের খোঁজ করলাম। বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছেন। আমাকে দেখে বললেন- এই বাড়ির মানুষগুলো খুবই ভালো। আমার বেশ যত্ন নিয়েছে।
মামুন ভাই ঠিকই বলেছেন, সত্যি সত্যি বাড়ির মানুষ গুলো খুবই ভালো। বাড়ির কর্তা ও কত্রী দু’জনই সংস্কৃতিমনা মানুষ। কর্তা আককাস আলী নামকরা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। তিনি গান করেন। আর কত্রী নাহার আককাস নিয়মিত কবিতা লেখেন। আগামী একুশে বইমেলায় তার নতুন কবিতার বই প্রকাশ হবে। এতো অমায়িক ভদ্র মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। আককাস আলী একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহ অধ্যক্ষ। অথচ খুবই সাধারন ভাবে চলাফেরা করেন। তার বাড়িতে প্রতি সপ্তাহে একটা গানের স্কুল বসে। যারা গান শিখতে আসে তাদেরকে কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না। আক্কাস আলী স্যার প্রতি মাসে এজন্য দশ হাজার টাকা খরচ করেন। আর তার স্ত্রী কবি নাহার আককাসের কথা এতো ছোটপরিসরে আজ আর লিখবো না। অন্য সময় লিখব। এই ভদ্রমহিলা দেখতে আমার ছোটবোন নয়নের মতো। দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড় করালে যমজ বোন মনে হবে। সেকথা তাকে একবারও বলিনি।

রেজানুর রহমানের সাথে
মোশারফ হোসাইন তযু ও রাজীবুল হাসান

বলছিলাম বারো রকমের মানুষের কথা। আগামীতে এই শিরোনামে একটা বই লিখবো আশাকরি। এখন পর্যন্ত এই বইয়ের আলোচিত চরিত্রে অন্তর্ভূক্ত হলেন, মাওনার এই সংস্কৃতিমনা পরিবার। আর আমাদের কবি ইজাজ আহমেদ মিলন। ও হ্যা, তার সহকর্মী ইকবাল আহমেদ নিশান ও মাওনার সাংবাদিক বন্ধুদের কথাও মনে পড়ছে। বিশেষ করে মনে পড়ছে পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গুণী অধ্যক্ষ এ কে এম আবুল খায়েরের কথা। আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন। আবুল খায়ের স্যারকে দেখে আমার বাবার কথাই বার-বার মনে পড়ছিল। আসলে শিক্ষক তো বাবার মতোই…

শ্রীপুর বার্তা/তযু , প্রকাশ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here