আজ শ্রীপুরে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা

0
243

মোশারফ হোসাইন তযু-নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ ১২ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর পাক-হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে শত্রুমুক্ত হয়েছিল গাজীপুরের শ্রীপুর অঞ্চলে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমনে টিকতে না পেরে ১১ ডিসেম্বর বিড়ালের মত রাতেই লেজ গুটিয়ে শ্রীপুর ছাড়তে শুরু করে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। ধর্ষণ, গণহত্যা, বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ,মালামাল লুন্ঠন আর  অবসর প্রাপ্ত সেনা সদস্যদের হত্যা, পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ১২ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা পশ্চিম পাকিস্তানী পাক-হানাদারদের হঠিয়ে  শত্রুমুক্ত করে বাংলার দামাল ছেলে মুক্তিযুদ্ধারা। আর সকালেই শ্রীপুরের মাটিতে উড়ে প্রথম লাল সবুজের স্বাধীন পতাকা।  সাধারণ নিরীহ মানুষের ওপর পাকবাহিনীর অত্যাচার, রাজাকারদের মাধ্যমে বাড়ি থেকে ধরে পাকিস্তানী ক্যাম্পে নিয়ে নারী ধর্ষণ, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে মুক্তিযোদ্ধার বাবা,মা, ভাই,বোন আত্বীয় স্বজনদের হত্যা করে গণকবর দেয়া, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাসহ নানা রকম ধ্বংস লীলা থেকে রক্ষার মধ্য দিয়ে শ্রীপুর থেকে পাক সেনাদের বিতাড়িত করেন মুক্তিযোদ্ধারা। শ্রীপুর থেকে পাকসেনাদের যোগাযোযোগের জন্য রেলপথ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। চারদিক থেকে আক্রমণের পর ১২ ডিসেম্বর শ্রীপুর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং আত্মগোপনে চলে যেতে থাকে রাজাকার ও তাদের দোসররা। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ নিরাপত্তার দায়িত্বে পাকিস্তানী সেনাদের সাথে শ্রীপুরের ইজ্জতপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। গোসিঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র কিশোর সাহাব উদ্দিন ওই যুদ্ধে শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় ও প্রচন্ড গুলি বর্ষণে সেখানে চারজন রাজাকার ও একজন পাকসেনাও নিহত হয়েছিল।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল পাক-হানাদার বাহিনী শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেয়। শ্রীপুর থানা, গোসিংগা কাচারি বাড়ি, কাওরাইদ রেলস্টেশন, সাতখামাইর রেলওয়ে স্টেশন, গোলাঘাট রেলওয়ে ব্রিজ, ইজ্জতপুর ব্রিজ, বলদি ঘাট হাইস্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্থানে গড়ে তুলে ৮টি পাক সেনা ক্যাম্প। রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে ট্রেনযোগে শ্রীপুর অ লে পাক হানাদারদের ছিল সহজ যোগাযোগ। শ্রীপুর থানায় ছিল পাক-হানাদারদের প্রধান ঘাঁটি। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী নিরীহ নারী পুরুষ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের ধরে এনে এসব ক্যাম্পে বর্বর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হতো। বাবার লাশটিও পেলেন না।

উপজেলার কেওয়া আকন্দবাড়ী গ্রামের শহীদ সাদির আকন্দের ছেলে নুরুজ্জামান আকন্দ বলেন, ১৯৬৫ সালে তাঁর বাবা তৎকালীন সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তরুন যুবকদেও প্রশিক্ষিত করে তোলার ভয়ে পাকিস্তানী সেনা সদস্যরা অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের চিহ্নিত করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল টঙ্গী অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলের সামনে ফজরের নামাজ শেষে তাঁর বাবা বাসায় ফিরছিলেন। তখন দেশে কারফিউ চলছিল। ওই অবস্থায় তাঁর বাবা পাক সেনাদের সাথে মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন। কথোপকথনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য হিসেবে তাঁর পরিচয় পাওয়ার পর সাতটি বুলেটের আঘাতে পাকিস্তানী সেনারা নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে। সবশেষে তার লাশটিও রেখে যায়নি হানাদার বাহিনী। স্বজনরা বিভিন্নস্থানে খুঁজে আজও তার সন্ধান পাননি।একে একে ১০ জনকে বেঁধে এনে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার সিরাজুল হক বলেন, কেওয়া আকন্দবাড়ীর শহীদ আলমগীর বাদশা আকন্দের ছেলে নজরুল ইসলাম আকন্দ মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ায় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানীরা বাড়ি থেকে তার বাবাকে ধরে এনে হত্যা করে। তার বাবা ফকির আলমগীর বাদশা আকন্দের সাথে আরও কমপক্ষে ১১ জনকে হত্যার পর গণকবর দেয়া হয়।পাকসেনাদের অবস্থান ও মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পনা,মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকসেনাদের স্থল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল রেলপথ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ এবং উত্তরের জেলাগুলোর সাথে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথকেই তারা নিরাপদ মনে করত। গোলা বারুদ ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র মালবাহী ট্রেনে আনা নেয়া করত। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বিশেষ করে রেল সেতু এলাকায় পাকিস্তানী ক্যাম্প তৈরী করে পাহারা বসিয়ে রাখত।

মুক্তিযোদ্ধা আ জ ম এনামুল হক বলেন, ওই দিন মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে হানাদার বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পরে। ১১ ডিসেম্বর রাতেই আস্তে আস্তে হানাদার বাহিনী শ্রীপুর ছাড়তে শুরু করে। ১২ ডিসেম্বর ভোরে শ্রীপুর সম্পূর্ণ রুপে পাক-হানাদার মুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পরে। ১২ ডিসেম্বর সকালে শ্রীপুর হাসপাতালের সামনে প্রথম উড়তে থাকে  স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here